মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬ - ১১:৫৮
শহীদদের রক্ত আমেরিকা ও জায়নবাদের আধিপত্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে

ইরাকের সুন্নি আলেমদের সংগঠনের সভাপতি শাইখ খালিদ আল-মুল্লা আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘শহীদ শিশু, মার্কিন আধিপত্যের পতন এবং ইসলামী উম্মাহর জাগরণ’-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, শহীদদের রক্ত আমেরিকা ও জায়নবাদের আধিপত্যের অহংকারকে ভেঙে দিয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে ইসলামী ও মানবিক জাগরণের এক নতুন ঢেউ সৃষ্টি করেছে।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ‘মাজমাউল আলামি কাদিমুন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এবং আল-কাওসার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এ সম্মেলনে তিনি বলেন, আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যা নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের সক্ষমতা এবং জায়নবাদী শক্তির ভীতিপ্রদ ভাবমূর্তির পতনের ইঙ্গিত বহন করে। তাঁর ভাষায়, প্রতিরোধযোদ্ধা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শক্তির মাধ্যমে এই আধিপত্যের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন—

یَا أَیُّهَا الَّذِینَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْیَهُودَ وَالنَّصَارَی أَوْلِیَاءَ...

হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করো না...
[সূরা আল-মায়িদা, ৫:৫১]

তিনি বলেন, এই আয়াত মুমিনদের সতর্ক করে দেয় যে, যেসব শক্তি ইসলামী উম্মাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের সঙ্গে এমন মিত্রতা গড়ে তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা মুসলিমদের স্বার্থ ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে বিশ্বশক্তি ও জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষায় অঞ্চলের জনগণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করেছে।

শাইখ খালিদ আল-মুল্লা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, সাংস্কৃতিক এমনকি ধর্মীয় অঙ্গনেও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে আসছে। বিভিন্ন প্রকল্প ও স্লোগানের আড়ালে তারা নিজেদের স্বার্থানুকূল ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শাসনের আগ্রাসন ও অপরাধকে সমর্থন করে কিংবা তার পক্ষে সাফাই গায়, তারা ইরান, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক এবং প্রতিরোধের অন্যান্য ভূখণ্ডে নিহত শহীদদের রক্তের দায় থেকে মুক্ত নয়।

ইরানের সামরিক কমান্ডার ও সাধারণ নাগরিকদের শাহাদাত এবং মিনাবের একটি বিদ্যালয়ে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় বহু শিশু ও শিক্ষার্থী প্রাণ হারায়। এসব নির্মম ঘটনা ইসলামী উম্মাহকে গভীরভাবে শোকাহত করলেও শত্রুপক্ষ একটি মৌলিক সত্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে—শহীদদের রক্তই জাতিসমূহের জাগরণ, প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদাবোধের উৎসে পরিণত হয়।

তিনি বলেন, এই সংঘাতের অন্যতম বাস্তবতা হলো—অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রভাব ও ভীতিপ্রদ ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তাদের অস্ত্রভাণ্ডার, যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক সক্ষমতা প্রতিরোধী জাতিগুলোর মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ইরানের জনগণের প্রতি সংহতির এই ঢেউ শুধু মুসলিম বিশ্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষও যুদ্ধের শিকারদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে।

বিশ্ব মুসলিম সমাজের সমর্থনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইরাকে ধর্মীয় নেতৃত্বের অবস্থান—বিশেষ করে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যিদ আলী সিস্তানি এবং ইরাকের সুন্নি আলেমদের বিবৃতি—ইরানের জনগণের প্রতি ইসলামী উম্মাহর সংহতির সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। জনসাধারণের সহায়তা এবং ত্রাণ-সহায়তার বহিঃপ্রকাশ এটিই প্রমাণ করে যে, আগ্রাসনের শিকার জনগণের পাশে দাঁড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ও মানবিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।

বক্তব্যের উপসংহারে শাইখ খালিদ আল-মুল্লা এই ঘটনাবলির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, প্রতিরোধী জাতিসমূহের সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নবাদী শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যের ভাবমূর্তি ভেঙে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, শহীদদের রক্ত—বিশেষত শহীদ শিশু এবং যুদ্ধের অন্যান্য নিরীহ শিকারদের আত্মত্যাগ—বিশ্বব্যাপী ইসলামী ও মানবিক জাগরণের এক নতুন স্রোতের জন্ম দিয়েছে।

পরিশেষে তিনি সম্মেলনের আয়োজক, এই বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া গণমাধ্যম এবং প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন জানানো জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণের দৃঢ়তা এবং ইরাক, মিসর, আলজেরিয়াসহ বিশ্বের স্বাধীনতাকামী জাতিগুলোর সমর্থনের প্রশংসা করে আশা প্রকাশ করেন যে, অবশেষে জুলুম, আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের ওপর ন্যায় ও সত্যের বিজয় প্রতিষ্ঠিত হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha